Blog

থিমের ছোঁয়া বীণাবাদিনীর মূর্তিতেও

147 Views0 Comment

সরস্বতী পুজো এলেই মনে পড়ে স্কুলের দিনগুলোর কথা। দিদিমণিদের সঙ্গে দল বেঁধে মেয়েরা যেতাম প্রতিমার বায়না করতে। এরপর অন্যান্য স্কুলে বাগদেবীর আরাধনার কার্ড পৌঁছে দিতাম আমরাই। মাস খানেক আগেই সারতাম প্রতিমার বায়না দেওয়ার কাজটা। আর যারা যেত না তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে নাস্তানাবুদ হতাম। কেউ বলত- হ্যাঁ রে রংটা সাদাই তো? কেউ আবার বলত- মাথায় কোঁচকানো চুল তো দেবীর? আর শাড়ির রং বাসন্তী তো নাকি সাদা? কারোর প্রশ্ন- কবে আর কখন আনা হবে মূর্তি? এই আমরা কিন্তু আনার সময় সবাই যাব। এহেন আরও কত কথা দেওয়া নেওয়ার পালা চলত আমাদের। আজও স্কুলে সেই দৃশ্য বর্তমান নিশ্চয়।…

তবে মানুষ আজ পরিবর্তন পিপাসু। সে সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন চায়। তাই সরস্বতী পুজো নিয়েও ছেলেমেয়েদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা আগের মতোই বিদ্যমান নাকি সেখানেও পরিবর্তন এসেছে তা বলা মুশকিল।
কিন্তু যে কথা বলা কঠিন নয়, বরং প্রমাণিত তা হল- রাজ্য রাজনীতি হোক বা সামাজিক পরিস্থিতি কিংবা নিজের সংসার মানুষ আজ পরিবর্তন চায় নিজের এবং পাশের মানুষটির আদবকায়দায়, পরিবর্তন চায় উৎসবের ঢঙে, পরিবর্তন চায় রীতি নীতি, আচার ব্যবস্থাতে। একইভাবে দেবী মূর্তির ক্ষেত্রেও আজ মানুষ বেছে নিতে চায় ‘জরা হটকে’ কিছু। আর তাই দুর্গা পুজো, কালী পুজোয় এত থিমের রমরমা। শুধু দুর্গা কিংবা কালী নয় থিমের জোয়ারে ভাসছে সরস্বতী পুজোও৷ পাটকাঠির, বেড়ার প্যাণ্ডেলের ট্রেন্ড ভেঙে উদ্যোক্তাদের মন মজেছে গুগল থিমে। একইভাবে দেবী সরস্বতীর তথাকথিত মূর্তিতে আজ মন ভরছে না উদ্যোক্তাদের। সেখানেও চাইছে থিমের ছোঁয়া। দেবী শ্বেত বস্ত্র পরিধান করেন। কিন্তু এখন অনেকেই চাইছেন দেবী অন্যরঙা শাড়ি পরুন। অনেকে আবার দেবীর গায়ের বর্ণও পাল্টে দিতে বলছেন। এসব কথা জানা গেল কুমোরটুলিতে গিয়েই।

শিল্পীদের কথায়- “আজকাল মানুষ সবকিছুর পরিবর্তন চাইছেন। ঐতিহ্য ভেঙে আধুনিকতায় মন সকলের। দেবীর গায়ের রং, শাড়ির রং এমনকী চোখের ঢং নিয়েও কারিকুরি করতে বলছেন অনেকে। আবার এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, আজকাল সরস্বতী পুজো নিয়ে মানুষের উৎসাহ কমেছে। আগে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা এক-দেড় মাস আগে এসে প্রতিমার বায়না করে যেত। এখন তারা আসে পুজোর এক সপ্তাহ আগে। আবার সেই মূর্তি তাদের মনের মতো করে ওই এক সপ্তাহের মধ্যেই তৈরি করে দিতে হয় আমাদের।”

পুরাণে বলা আছে, প্রজাপতি ব্রহ্মার মুখ থেকে জন্ম বিদ্যাদেবীর। তাই তাঁর সকল দীপ্তি আর সৌন্দর্যের উৎস ব্রহ্মা। তিনি শিক্ষা, শিল্পর দেবী। তাঁর মূর্তিতে শৈল্পিক ছোঁয়া থাকবে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেই শিল্পেও চাইছে থিমের ছোঁয়া। বিদ্যাদেবীর তথাকথিত যে মূর্তি দেখে আমরা অভ্যস্ত সেই মূর্তি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এমনটাই দাবি শিল্পীদের। আগামীদিনে এই পরিবর্তনের জোয়ার শিল্পীদের ঠিক কোন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে তা বলা কঠিন। কারণ দেবী সরস্বতীর যে বিশেষ ঢঙের মূর্তি তাঁদের দৃশ্যপটে আঁকা হয়ে আছে তার থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ অন্য কায়দায় শিক্ষাদেবীর মূর্তি বানানো সত্যিই চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয় তাঁদের কাছে। সরেজমিনে বিচার করে এই সিদ্ধান্তে আসাই ভাল, মানুষ যেমনটি চায় তেমনটিই গড়ে তোলা বুদ্ধিমানের কাজ। তার জন্য চোখ আর শিল্পকলাকে আরও একটু যুগোপযোগী করে তোলা প্রয়োজন। আবার এও ঠিক, সবাই তো আর থিমের পুজো পছন্দ করে না, তাদের জন্য থাক সাবেকি প্রতিমা, ঐতিহ্যের প্রতিমা।

– নবনীতা দত্তগুপ্ত