Blog

বই নাকি ই-বই?

180 Views0 Comment

তিতিরের একটা বইয়ের খুব প্রয়োজন। কোনও এক লেখকের লেখা বইতে ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপ’-এর চ্যাপ্টারটা জমিয়ে লেখা আছে। তাই ওইটাই চাই তার৷ সারা বই পাড়া ঘুরেও পায়নি সে। সকলের মুখে একই কথা- “দুদিন পর আসুন। পেয়ে যাবেন। এনে রাখব।” কিন্তু তিতির থাকে কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে। চাকদায়। দুদিন পর আবার কলকাতায় শুধু একটা মাত্র বইয়ের জন্য আসা সত্যিই কষ্টকর তার কাছে। কিন্তু বইটা তো ওর চাই-ই চাই। তাই কলকাতা থেকে খালি হাতে বাড়ি ফিরে সে বেজায় চিন্তিত। এরই মাঝে তার বাড়িতে হাজির তার এক ‘তুতো দিদি। সে আবার বই মানেই আজকাল ই-বুক বোঝে। গল্পের বই হোক বা লেখাপড়ার বই, সে পড়ে নেয় কিন্ডলে। সে তিতিরকে বলে- “বই কিনতে কলকাতা যাচ্ছিস? ই-বুক আছে কী করতে? আমি তো বাবা, ওখানেই সব পেয়ে যাই।” তিতির কঠিন কণ্ঠে জবাব দেয়- “আমার ই-বুক নেই। আর আমি ই-বুকে মজাও পাই না বই পড়ে।” তিতিরের সেই অত্যাধুনিক দিদিভাই খুব একচোট হেসে নেয় তার উপর। রেগে যায় তিতির।…

এহেন চিত্র প্রায়ই ধরা পড়ে কলেজ পাড়াতে। এমনকী নিজেদের বাড়িতেও। কেউ কাগজের বই পৃষ্ঠা উল্টে পড়তে ভালোবাসে। কেউ বা বই পড়ার পাশাপাশি বইয়ের গন্ধ শুঁকতে ভালোবাসে। বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দে অনেকের আবার পরের পৃষ্টার প্রতি আগ্রহ জন্মায়৷ কেউ আবার ভালোবাসে ই-বুক পড়তে। বই দোকান থেকে কেনো রে, আনো রে, পৃষ্ঠা ওল্টাও রে– এসবের দিকে আজকাল মানুষের ঝোঁক কমছে। অধিকাংশের জীবন আজ মুঠো ফোনে বন্দি। বই উল্টেপাল্টে দেখার সময় কই তার কাছে? আগে মানুষের হাতে মোবাইল ছিল না। ফেসবুকে মুখ গুঁজে অন্যের পোস্টে লাইক দেওয়ার ট্রেন্ড ছিল না। তাই নিস্তব্ধ শ্রান্ত দুপুরে ভাতঘুম দেওয়ার আগে মানুষ একখানি বই হাতে নিয়ে বিছানায় শুতে যেতেন। আর এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল। হোয়াটস আপ, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে ভরা সাম্রাজ্য। এগুলির দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই কেটে যায় অনেকটা সময়। আর যাঁদের এই সময় গল্প পড়ার শখ তারাও আজকাল মুখ গুঁজেছেন ই-বুকে। কারণ সময় এগিয়েছে। আধুনিকতার আস্তরণ পড়েছে সকলের উপরেই। তাই শুধুই যে ভাল লাগার কারণে মানুষ বই ছেড়ে ই-বুক মুখী হচ্ছে তা নয়, খানিকটা নিজেদের অত্যাধুনিক প্রমাণ করার তাগিদেও এই পথ বেছে নিয়েছে অনেকে।

এখন কথা হল কারা আজও বইমুখী? আর কারা আজকাল ই-বুক’কে আপন করে নিয়েছে নিজেদের জীবনের সঙ্গে? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জাস্ট স্টুডিও’র ‘জনতার দরবারে’ হাজির হয় বই পাড়ায়৷ কথা বলে বেশ কয়েকজন কলেজ পড়ুয়ার সঙ্গে। এমনকী বই বিক্রেতা এবং প্রকাশকদের সঙ্গেও কথা বলে জাস্ট স্টুডিও টিম।
কোনও কোনও ছাত্র-ছাত্রী আজও বইয়ের পাতা উল্টে পড়তে ভালোবাসে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি কেউ সত্যিই বই পড়তে ভালোবাসে সে কিন্ডলের জায়গায় একটা বই অনায়াসে ব্যাগে ক্যারি করতে পারে। এমনকী আজও এমনটা করেন অনেকে। কিন্ডল বা ই-বুক আধুনিকতার বহিঃপ্রকাশ। কাগজে ছাপানো বইয়ের কদর কমবে না কোনওদিন।
অনেকে আবার জানিয়েছেন- “যুগের সঙ্গে তাল মেলাতেই হবে৷ আর তাই ই-বুক বেছে নিচ্ছে মানুষ। ছাপানো বই একেবারে উঠে যাবে এমনটা নয়। তবে, সকলকেই যুগের কথা মাথায় রেখে চলতে হবে। যারা আজ বই বিক্রি করছে তারাও একদিন হয়ত চলে আসবে ই-বুকের আওতায়। তবে, ই-বুকের একটা মন্দ দিক আছে। এখানে শুধুই ইংরেজি বইয়ের রমরমা। বাংলা বইকে ই-বুকে আরও বেশি করে জায়গা দিতে হবে। তা হলেই আমাদের মতো পড়ুয়াদের সুবিধা বেড়ে যাবে। বই পড়তে ভালো লাগে না এমনটা নয়। তবে রাত জেগে যখন পড়ি তখন ই-বুক ভাল সঙ্গ দেয়। কোনও বইয়ের রেফারেন্স দরকার হলে অসুবিধা হয় না। একটা ক্লিকেই চোখের সামনে খুলে যায় পাতার পর পাতা। তবে সেটা ডাউনলোড করতে হয় এই যা। এখন ইন্টারনেট প্যাকেরও অনেক সুবিধা রয়েছে। ফলে, যখন তখন ডাউনলোড করাটাও কঠিন নয়৷”

পড়ে রইল গল্পের বইয়ের কথা। সেখানেও আজ জায়গা করে নিয়েছে ই-বুক। চাহিদার কারণে দামও কমেছে কিন্ডলের। গল্প পিপাসুরা বইয়ের বদলে একখানি কিন্ডল ব্যাগে পুরে নিয়েই যাচ্ছে এদিক সেদিক। তাদের মতে, বইপত্তর নিয়ে গিয়ে ব্যাগ ভারি হয়ে যাচ্ছে। আর একটা কিন্ডল ব্যাগে ঢুকে যাচ্ছে নিমেষে। জায়গাও নিচ্ছে না বেশি।”…
এত সব যুক্তি আর অ-যুক্তির মধ্যেই শুরু হয়েছে ‘কলকাতা বইমেলা’। ভিড় জমছে রোজ। সেখানে তো কিন্ডলের জায়গা নেই। তা হলে যাঁরা ভিড় জমাচ্ছে তাঁরা কি নিছইকই ঘুরতে যাচ্ছেন বইমেলায়? নাকি বইও কিনছেন? তা হলে কি বইগুলো না পড়ে শুধু শোকেস সাজানোর জন্য কিনছেন তাঁরা? তাঁরাই ভাল জানেন এই প্রশ্নের উত্তর।
আলোচনা চলবেই এই নিয়ে। থামার নয়। কেউ বলে -“চাই বই।” কেউ বলে -“ই-বুকই সেরা।” তাই যা মনে হয় তা হল, এক শ্রেনীর মানুষ আজও বই হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উলটে পড়তে ভালোবাসেন। আর সেই সংখ্যাই বেশি আজকের দিনে দাঁড়িয়েও। কারণ বহু প্রবীণের হাতে এখনও কিন্ডল পৌঁছয়নি। অথচ তাঁরাই বই হাতে সময় কাটান বেশি। আর যাঁদের হাতে কিন্ডল আছে তাঁদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। তাই পড়ার সময়ও তাঁদের কাছে কম। ই-বুকের কার্যকারিতা কিংবা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অমূলক। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোবাইল ফোন যেমন আবালবৃদ্ধবনিতার হাতে হাতে ঘোরে, একদিন হয়ত সেই জায়গা নেবে কিন্ডলও। প্রশ্ন হল সেদিন কি হারিয়ে যাবে কাগজের বই? হারিয়ে যাবে মলাট দিয়ে গুছিয়ে পড়ার দিন? হারিয়ে যাবে লুকিয়ে লুকিয়ে বইয়ের গন্ধ শোঁকার সেই একান্ত মুহূর্ত? সময়ই জানান দেবে সেই কথা।…

– নবনীতা দত্তগুপ্ত