Blog

এক মূর্তি মানবের উপাখ্যান/আজকের বাল্মিকী

121 Views0 Comment

কেউ কাটছে চিমটি, কেউ মারছে ঢিল, কেউ বা দিয়ে চলে যাচ্ছে ধাক্কা, কেউ বা বলছে-গাজা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনও বা পিঁপড়েরা কামড়ে চলে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে।…
এর কোনও কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ নেই যাঁর তিনি কৃষ্ণ বৈরাগী৷ তিনি মূর্তি মানব। মূর্তি সেজে দাঁড়িয়ে থাকেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কখনও স্বামী বিবেকানন্দ, কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও বা শ্রী রামকৃষ্ণ সেজে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন অন্যদের মনোরঞ্জন করতে। টানা ৪-৫ ঘণ্টা সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকার মন্ত্র তিনি নিজেই নিয়েছেন। লোকে দেখে বুঝতেই পারে না এ কোনও মাটি বা অন্য কোনও ধাতুতে গড়া মূর্তি নাকি মূর্তি মানব! কেউ এই কাজ তাঁকে শিখিয়ে দেননি। একসময় এটা ছিল তাঁর নেশা। আর আজ সেই নেশাই পরিণত হয়েছে পেশায়। আজ তাঁর খ্যাতিও কম নয়।

তাঁর কথা শুনলে এবং জানলে মনে পড়ে যায় বাল্মিকী মুনির কথা৷ ইতিহাসের দৌলতে জেনেছি রত্নাকর দস্যু যখন ধ্যানমগ্ন ছিলেন তখন তাঁর শরীরে নাকি উই পোকা ঢিপি তৈরি করে ফেলেছিল। টের পাননি তিনি। এতটাই নিজের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন দস্যু রত্নাকর। পৃথিবীর কোনও আলো এবং অন্ধকার স্পর্শ করতে পারেনি তাঁকে। কত হিংস্র জন্তুও তাঁর পাশ থেকে চলে গেছে, টেরও পাননি তিনি। এই রত্নাকর দস্যুই ইতিহাসের পাতায় পরিচিত হয়ে আছেন বাল্মিকী মুনি নামে। তিনিই ‘রামায়ণ’-এর রচয়িতা। এমনই এক নিষ্ঠাবান মগ্নপুরুষের নাম কৃষ্ণ বৈরাগী৷ তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে জাস্ট স্টুডিও হাজির হয় তাঁর মুলুকে৷ বাগুইহাটি থেকে বেশ কিছুটা অন্দরে তাঁর বাস। সাদামাটা বাড়ি, বিলাসিতার লেশমাত্র নেই। তবে, চারদিকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পুরস্কার, ছবি আর মেমেন্টো।
অনেক ছোট বয়স থেকে সংসারের সব দায়ভার তাঁর উপরে। গান গাইতে ভালোবাসেন৷ অর্থের অভাবে শিখতে পারেননি গান। তবে, লোকসঙ্গীত এমন গেয়ে শোনাবেন যে মনেই হবে না কোনও তালিম নেই তাঁর কাছে। গোষ্ঠ গোপালের গান গাইতে ভালোবাসেন কৃষ্ণ বৈরাগী। তবে, তাঁর সর্বজনবিদিত পরিচয় ‘কসপ্লেয়ার’ অর্থাৎ ‘মূর্তি মানব’।
প্রসঙ্গত, কসপ্লেয়াররা বিভিন্ন মনুষ্য চরিত্র সেজে কোনও উৎসব-অনুষ্ঠানে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। মানুষ তাঁদের দেখে মজা পান, ঠাট্টা করেন, কত রকমের কথা বলেন৷ কিন্তু মূর্তি মানব কোনও কথায় উত্তর দেন না। কারণ তিনি তখন স্ট্যাচু, রক্তমাংসে গড়া মানুষ নন। কৃষ্ণ বৈরাগী বলেন- “আমি যখন সাজি আর মূর্তি হয়ে দাঁড়াই তখন আমি সেই চরিত্রটিই হয়ে যাই। আমি আর কৃষ্ণ থাকি না। আমি নিজের মধ্যেই থাকি না তখন। কেউ আমায় ঠেলা দেয়, কেউ বলে চলে যায় যে আমি গাজা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কেউ বা চিমটি কাটে আবার কেউ নানা ধরনের কটু কথা বলে চলে যায়। এদের মধ্যে অনেকেই আমার চেনা পরিচিত। মূর্তি মানুষ হয়ে কত লোককে যে চিনে নিলাম তা বলে শেষ করতে পারব না।”

ছোটবেলায় স্কুলের এবং পাড়ার অনুষ্ঠানে এরকম সাজতেন তিনি। কোথাও প্রতিযোগিতা হলে নামও দিতেন। প্রতি জায়গা থেকেই আসত ফার্স্ট প্রাইজ৷ তাই অনেক জায়গায় তাঁর নামই নেওয়া হত না। সবাই জানত কৃষ্ণ বৈরাগী অংশগ্রহণ করলে সে’ই পাবে প্রথম প্রাইজ! মূর্তি সেজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টা ছিল তাঁর নেশার জায়গা। কবে যে তা পেশা হয়ে গেল নিজেই বুঝতে পারেননি কৃষ্ণ বৈরাগী।
সালটা ১৯৯৯, এলাকার স্বামী বিবেকানন্দ ক্লাবের দুর্গা পুজোয় তিনি উদ্যোক্তাদের বললেন যে তিনি সেখানে নতুন কিছু করতে চান৷ তিনি স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়াবেন। রাজি হয়ে যায় উদ্যোক্তারা। টানা ৫ ঘণ্টা পাঁচদিন দাঁড়িয়ে পেয়েছিলেন মাত্র ৫০০ টাকা। সেই শুরু। এরপর নানা জায়গা থেকে ডাক আসতে থাকে মূর্তি মানবের। আজ তাঁকে সবাই চেনে। দেখতে দেখতে ২০ টি বছর অতিক্রান্ত। নিজেই সাজেন তিনি। নেই কোনও ট্রেনার। সম্পূর্ণভাবে নিজের প্রচেষ্টায় নিজের কারিকুরিতে এবং কারিগরিতে আজ তিনি মূর্তি মানব। জাস্ট স্টুডিও ‘murtiMAN’ নাম দিয়েছে তাঁর।
বাংলা চলচ্চিত্রেও জায়গা পেয়েছে কৃষ্ণ বৈরাগীর জীবন৷ পরিচালক বিক্রমজিৎ গুপ্ত তাঁকে নিয়ে একটি বাংলা ছবি বানিয়েছেন। ছবির নাম ‘অচল’।
হরনাথ চক্রবর্তী একবার তাঁকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হন, আপ্লুত হন। দেখা করতে বলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা ছবিতে টুকটাক কাজ পান কৃষ্ণ বৈরাগী৷ সেরকম বড় কোনও কাজ না পেলেও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়ায় আপ্লুত কৃষ্ণ। নিজের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আর স্বল্প রোজগার নিয়েই খুশি তিনি। সুখী তিনি। নিজের ভাবনা, পরিকল্পনা আর ইচ্ছা শক্তিকে সম্বল করেই এগিয়ে চলে মূর্তি মানব কৃষ্ণ বৈরাগীর জীবন। কোথাও কোনও বাধা নেই, নেই চোখরাঙানি, নেই অন্যের তাঁবেদারি করার ঝক্কি। তিনি নিজেই নিজের ধারক ও বাহক এমনকী শাসক। তিনি নিজেই নিজের গুরু, নিজেই নিজের কর্তা, নিজেই নিজের প্রভু। তাই বলতেই হয় ‘murtiMAN’ তোমারে সেলাম।

– নবনীতা দত্তগুপ্ত

Video URL: https://www.youtube.com/watch?v=3xAoPkmnElY&feature=youtu.be