Blog

শঙখ ব্যবসায় নারাজ ব্যবসায়ীদের উত্তরসূরীরা

258 Views0 Comment

কবি জসীমুদ্দিন তাঁর ‘পলায়ন’ কবিতায় লিখেছিলেন একটি লাইন- “…লাল-চেলী আর শাঁখা সিন্দুর আলতার রাগে সাজিয়েছি দেহখান।…” শুধুই কি সাজের জন্য বাঙালি বঁধূকূল পরেন শাঁখা-সিঁদুর-আলতা? না। শাঁখা-সিঁদুর আসলে পরিচিতি। শাঁখা-সিঁদুর বাংলার ঐতিহ্য৷ শাঁখা-সিঁদুর পরিহিতা নারী জানান দেন যে তিনি বাঙালি। আরও একটি দিক জানান দেয় যে তিনি কারো অভিভাবকত্বে রয়েছেন। এতে নারী কোনও বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পান।

কথিত আছে, স্বামীর মঙ্গলকামনায় হিন্দু বাঙালি নারী শাঁখা, পলা আর সিঁদুর পরেন। পরেন একটি নোয়াও। এটা একটা চল, একটা রীতি। এর মাঝেও আছে এক বৈজ্ঞানিক যুক্তি। শাঁখায় থাকে ক্যালসিয়াম, পলায় প্রবাল আর নোয়ায় থাকে লোহা। প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের সময়ে মেয়েদের শরীর থেকে অনেক ক্যালসিয়াম আর আয়রন বেরিয়ে যায়, শাঁখা ও পলা সেই ঘাটতি পূরণ করে৷
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুযায়ী, সতী নারী তুলসি দেবী একদিকে ছিলেন শঙ্কাসুরের স্ত্রী এবং অন্যদিকে বিষ্ণুভক্ত। শঙ্কাসুর নাস্তিক৷ তাঁর পাপের ঘড়া পূর্ণ হওয়ার পর তাঁকে বধ করে তাঁর অস্থি বিসর্জন দেওয়া হয় ভারত মহাসাগরের জলে। তাঁর পতিব্রতা স্ত্রী তখন বিষ্ণুর কাছে তাঁদের নিজেদের অমরত্ব প্রার্থণা করেন। বিষ্ণু তুলসির কথা ফেলতে পারেননি। তিনি তুলসিদেবীকে বর দেন- তুলসির দেহ থেকে তৈরি হবে তুলসি গাছ যা প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে৷ আর শঙ্কাসুরের অস্থি থেকে তৈরি হবে নারীর এক অপূর্ব অলঙ্কার যা তা বিবাহের প্রতীক হিসেবে জ্বলজ্বল করবে। সেই থেকেই শাঁখা পরার চল৷

সময় বদলেছে। নানা ধরনের একসেসরিজ এসে গেছে বাজারে। পাল্টেছে ফ্যাশন দুনিয়া। বেশিরভাগ মহিলাই আজ পরতে চান না শাঁখা-পলা। তাঁদের মতে শাঁখা-পলা পরলে ব্যাকডেটেড লাগে৷ অনেকে আবার বলেন “গেঁয়ো লাগে।” আর তাই হয়ত আজ ধুকছে শঙখ ব্যবসা। কেনার লোকের আজ বড় অভাব৷ কেবল বিয়ের সিজনে একটু ব্যবসার মুখ দেখেন বিক্রেতারা। বাকি সময়ে চাহিদা থাকে না বলাই ভাল।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে মানেকা গান্ধী কেন্দ্রের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শঙখ জাতীয় দ্রব্য ব্যান করেন। এরপর বহু আন্দোলনের ফলে তা ফিরে আসে। সেই সময় একটু হলেও চাহিদা ছিল শাঁখার। দিন যত এগোচ্ছে মহিলাদের মধ্যে শাঁখা পরার প্রবণতা কমছে। কালেভদ্রে উৎসব-অনুষ্ঠানে তাঁরা শাঁখা পরেন। উৎসব কাটলেই খুলে যত্ন করে আবার জায়গারটা জায়গায় রেখে দেন তাঁরা৷ সত্যি কথা বলতে কি সবসময় শাঁখা হাতে পরা থাকলে অনেক সময় তা বেড়েও (ভেঙে) যায়। ফলে শাঁখায় অভ্যস্ত মহিলারা ফের তা কিনে পরার কথা ভাবেন এবং কেনেন। আজ সেই দিন অতীত।…

ব্যবসা তাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে আজ।ঠিক এই কারণেই আজকের ব্যবসায়ীদের উত্তরসূরীরা আর আসতে চাইছেন না এই ব্যবসায়। কারণ এর কোনও ভবিষ্যৎ নেই। দিন দিন এর কদর আরও কমবে।
তবে, জাস্ট স্টুডিওর প্রতিনিধিরা একজন শাঁখা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জানতে পারলেন একটু অন্য গল্প। তিনি জানালেন আধুনিকারা আজকাল শাঁখা চাইছেন। এক জোড়া নয়, তাঁরা চাইছেন তিন জোড়া একসঙ্গে, একই মাপের। কারণ তাঁরা শাঁখা পরবেন নিজেদের ইউনিক লুকে সাজাতে। ফলে, একেবারেই যে ব্যবসা নেই তেমনটা নয়। তবে, আগের মতো সেই রমরমা ব্যবসা আর নেই।
সুতরাং বলতে বাঁধা নেই, শঙখ ব্যবসায়ীরা আজ বেশ সমস্যার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন। যা তাঁরা নিজেরাই বললেন জাস্ট স্টুডিওর প্রতিনিধিদের কাছে।

– নবনীতা দত্তগুপ্ত