Blog

বহু ইতিহাসের সাক্ষী ‘কলকাতার স্ট‍্যাম্পম‍্যান’

156 Views0 Comment

“তিনি বৃদ্ধ হলেন
বনস্পতির ছায়া দিলেন সারাজীবন।
এই বুড়ো গাছের পাতায় পাতায়
সবুজ কিন্তু আজো মাতায়
সুঠাম ডালে।”

আমহার্স্ট স্ট্রীটের মুখে পদ্ম রেস্টুরেন্টের পাশের গলি তাঁর ঠিকানা। ডিটিপি বা ছাপাখানার নিজস্ব দোকান রয়েছে তাঁর। সকাল থেকে সন্ধ‍্যে পর্যন্ত সেখানেই দেখা মেলে এই প্রবীন যুবকের। মাঝে দুপুরের দিকে একবার শুধু ঘন্টাখানেকের বিশ্রাম চাই তিরাশি ছুঁই ছুঁই এই মানুষটির। তিনি আবার এক চলমান ইতিহাসও। সময় করে একবার তাঁর কাছে গেলেই স্মৃতির ঝাঁপি আলগা করে শোনাতে থাকেন নানান অভিজ্ঞতার সব কাহিনী। বিশ্বযুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ব্রিটিশ আমল, বিদেশীদের শোষন, সেইসময়কার আর্থ-সামাজিক অবস্থা সব অভিজ্ঞতার কাহিনী যেন টাটকা, সতেজ। সারাজীবনে সংগ্রহ করেছেন কয়েক লক্ষ স্ট‍্যাম্প। ইন্ডিয়ান সিনেমার ওপর নির্মিত ডাকবিভাগের সমস্ত স্ট‍্যাম্প রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। আক্ষরিক ভাবেই তিনি ‘স্ট‍্যাম্পম‍্যান’। ‘কলকাতার স্ট‍্যাম্পম‍্যান’ এর পোশাকি নাম দীপক দে।

১৯৩৮ সালে বাংলাদেশে জন্ম প্রবীন এই ‘যুবকের’। দেশভাগের সময় চলে আসা এ দেশে। উদ্বাস্তু মনের জ্বালা তিনি জানেন। নিজের ভিটে মাটি পেছনে ফেলে চোখের জলে নিজের দেশকে শেষবার দেখে নেওয়ার কষ্ট তিনি অনুভব করতে পারেন। বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের বিশ্ব তাঁর চাক্ষুষ করা। স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াই তাঁর শিরায় শিরায়। ব্রিটিশ করায়ত্ত ভারতবর্ষকে স্বাধীনতার স্বাদ দিতে যে অপরিসীম লড়াই লড়তে হয়েছিল ভারতবাসীকে, তার প্রত‍্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল তাঁর জীবনেও। লড়েছেন অনেক। নিজের জীবনে। সমাজে।

লড়তে লড়তেই শিখেছেন কেমন করে বাঁচিয়ে রাখতে হয় নিজের প‍্যাশন। নিজের ভালোলাগা। ইচ্ছে। শখ। চিঠি পাঠাতে গিয়েই বোধহয় ভালোবাসা জন্মেছিল স্ট‍্যাম্প অর্থাৎ ডাকটিকিটের উপর। সংগ্রহ করতে শুরু করলেন স্ট‍্যাম্প। সত‍্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’র ওপর তৈরী সিনেমার স্ট‍্যাম্প দেখার পর তাঁর স্ট‍্যাম্প সংগ্রহের নেশা জন্মায়। সেই শুরু। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শখ। শখ এরপর পরিণত হয় উন্মাদনায়। ক্রমশ জমতে থাকে একের পর এক স্ট‍্যাম্প। এখন তাঁর কাছে সংগৃহীত স্ট‍্যাম্পের সংখ‍্যা সাত থেকে আট লক্ষ। রয়েছে সোনা, রূপো, ক্রিস্টাল, মুক্তোর তৈরী স্ট‍্যাম্পও। ভারতীয় সিনেমার ওপর ডাকবিভাগের নির্মিত সমস্ত স্ট‍‍্যাম্প রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমার ওপর তৈরী স্ট‍্যাম্পও। মেরিলিন মনরো, চার্লি চ‍্যাপলিন থেকে শুরু করে হলিউডের তাবড় তাবড় অভিনেতাদের ওপর তৈরী স্ট‍্যাম্প রয়েছে তাঁর কাছে। বাংলা ছবি ‘চোখের বালি’র বেশ কিছু স্ট‍্যাম্প বানানো হয়েছিল ভারতীয় ডাকবিভাগের তরফ থেকে। প্রখ‍্যাত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের একাধিক ছবির স্ট‍্যাম্প তৈরী হয়েছে। সেইসব সযত্নে রক্ষিত তাঁর অ‍্যালবামে। নানান বিষয়ের, নানান সময়ের, নানান আঙ্গিকের আজ পর্যন্ত যতগুলো স্ট‍্যাম্প তৈরী হয়েছে সেই সব স্ট‍্যাম্প সংগৃহীত তাঁর সংগ্রহশালায়। নিজের সন্তানের মতো লালন করেন তাঁদের। নিবিড় যত্নে গচ্ছিত থাকে তারা। প্রতিটি অ‍্যালবামের পাতায় পাতায় সাজানো আছে সেসব। জীবনের প্রতিটা অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন ভরেছে, তেমনি একটার পর একটা স্ট‍্যাম্পের কালেকশনে ভরে উঠেছে তাঁর ঘর। হয়ে উঠেছেন ‘কলকাতার স্ট‍্যাম্পম‍্যান’। ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে করতেই কখন তিনি হয়ে উঠেছিলেন ডাকটিকিট নকশাকার। ডিজাইন করতে থাকলেন একটার পর একটা ডাকটিকিট। স্ট‍্যাম্পের সঙ্গে আরও নিবিড় বন্ধন তৈরী হল তাঁর। ভারতীয় ডাকবিভাগ থেকে বায়না পেলেন স্ট‍্যাম্প ডিজাইন করবার। বানালেন একের পর এক স্ট‍্যাম্প। চলতি বছরে ডাকবিভাগের তৈরী ক‍্যালেন্ডারে লেখা আছে ক‍্যালেন্ডার ডিজাইনার দীপক দে’র নাম। কবিগুরুর শতবর্ষ এবং সার্ধ শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মরণে তৈরী হয়েছে একাধিক স্ট‍্যাম্প। সে সব কালেকশনও তাঁর কাছে পরম মমতায় সংরক্ষিত। ঘরভর্তি সব ডাকটিকিটের প্রদর্শনীও হয়েছে বেশ কয়েকবার। NFDC অর্থাৎ National Film Devolopement Corporation of India

মুম্বাইতে আয়োজন করে তাঁর সংগ্রহের ওপর একটি প্রদর্শনীর। অত‍্যন্ত সম্মানের এই প্রদর্শনী তাঁকে কিছুটা হলেও স্বীকৃতি দিয়েছিল।অবশ‍্য তিনি কোনদিনই আশা করেননি কোন স্বীকৃতির কিংবা কোন পুরস্কারের। তবুও তাঁর কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে এসেছে বেশ কিছু পুরস্কার, স্বীকৃতি, সম্মান। স্ট‍্যাম্পই তাঁর ধ‍্যান, স্ট‍্যাম্পই তাঁর জ্ঞান। সকাল থেকে সন্ধ‍্যে পর্যন্ত স্ট‍্যাম্প সংগ্রহ করে যান তিনি। আর এই সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যেতে পারলেই তিনি খুশি। স্ট‍্যাম্প নিয়েই মেতে থাকেন সারাটাক্ষণ। ‘কলকাতার স্ট‍্যাম্পম‍্যান’ দীপক দে’র ভান্ডারে ক্রমশ ক্রমবর্ধমান স্ট‍্যাম্পের কালেকশান। অশক্ত শরীরেও স্ট‍্যাম্প নিয়ে কিছু বলতে থাকলে ঘোলাটে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে তাঁর। বহমান ইতিহাস ছড়িয়ে থাকে তাঁর গালের বলিরেখায়, কপালের ভাঁজে ভাঁজে। একের পর এক জমতে থাকে স্ট‍্যাম্প, অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, কথারা…

– মউলি রায়