Blog

কঠিন কথা সহজে বলার পথ মূকাভিনয়

188 Views0 Comment

‘মূকাভিনয়’– এ এক অন্য শিল্পের নাম। গুনগুন করে গান গাইতে, দু’কদম নাচ নাচতে আমরা অনেকেই পারি, আবৃত্তিও পারি সকলে কম বেশি। কিন্তু মূকাভিনয়? সবাই পারি কি? না বোধহয়। বোধহয় কেন? আলবাত পারি না সকলে। কথা না বলে নিজের বলতে চাওয়া কথা অন্যকে সহজে বুঝিয়ে দেওয়া সহজ কাজ নয়। আর এই কাজটাই প্রথম করার চেষ্টা করেন যোগেশ দত্ত। জগতজোড়া নাম তাঁর। মূকাভিনয়ের প্রাণপুরুষ বা পথিকৃৎ তিনিই।

শিল্পীর জন্ম ১৯৩৫ সালে ফরিদপুরের মাদারিপুর সাব ডিভিশনে। দেশভাগের পরে চলে আসা শহর কলকাতায়। এক চালের ঘরে আশ্রয়। সেদিন নাকি খাবার জোটেনি তাঁর পরিবারের কপালে। বয়স তখন ১০-১১। কিছুদিনের মধ্যেই মারা যান বাবা-মা। ঠাঁই জোটে মামাবাড়িতে। সেখানেও সায় দেয়নি ভাগ্য। মামাতো ভাইয়ের দুর্ব্যবহারে ছাড়েন মামাবাড়ি। এরপর অজানা উদ্দেশ্যে হাওড়া থেকে চেপে বসেন ট্রেনে। পকেটে সেদিন একটা টাকাও ছিল না। টিটি রামপুরহাট স্টেশনে কান ধরে নামিয়ে দেয়। সেদিন একজন পাঁচটি টাকা হাতে দিয়েছিলেন তাঁকে। এরপর রামপুরহাটেই একটা চায়ের দোকানে কাজ পান। একে একে মুদি দোকান, হোটেল সব জায়গাতেই কাজ করেন। তখন নিজের নাম নিজেই দেন ভোলা। ভাগ্য তারপর নিয়ে যায় ফারাক্কাতে। এরপর গড়িয়েছে অনেক জল। বয়ে গেছে অনেকটা সময়। ফিরে আসা ফের কলকাতায়। রোজ বিকেলে বেড়াতে যেতেন লেকে। সেখানে প্রেমিক যুগলের ঘোরাফেরা দেখতেন। তাদের কথা শোনা যেত না। কিন্তু তাদের অঙ্গভঙ্গিতে বুঝতে পারতেন তারা কী বলছে। মাথায় একটা বুদ্ধি এল তাঁর। এভাবে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও তো একটা শিল্প গড়ে তোলা যায় তো।
এরপর হাওড়ার এক অনুষ্ঠানে তিনি মঞ্চস্থ করলেন আয়নার সামনে মেয়েদের সাজগোজ নিয়ে এক নির্বাক কৌতুক। সালটা ১৯৫৬। সেই শুরু। এরপর ইডেনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভি বালসারার অনুষ্ঠানের পর তাঁর নাম ঘোষণা করা হয় ‘নির্বাক কৌতুক’ প্রদর্শনের জন্য৷ দর্শক ব্যাপারটা ভালভাবে নিতে পারেনি। জুতোও ছোঁড়ে তাঁর দিকে লক্ষ্য করে। এরপর তিনি হাতজোড় করে সকলের কাছে অনুরোধ রাখেন একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য৷ সুযোগ মেলে অবশেষে। কথা দেন যদি তাঁর অনুষ্ঠান পছন্দ না হয় তা হলে তাঁরা জুতোপেটা করতে পারবেন। সেদিন তাঁর পরিবেশনায় উঠে আসে এক বেকার ছেলের যন্ত্রণার কথা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এক্সপ্লয়টেশন অফ রবীন্দ্রনাথ’। পারফরম্যান্সের সময় এতটাই বিভোর হয়ে যান যে মঞ্চেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান তিনি। জ্ঞান ফিরলে করতালির আওয়াজে ভেসে যান তিনি।…
প্রথমে তিনি তাঁর এই শিল্পকলার নাম দেন ‘নির্বাক কৌতুক’। তবে, তাঁর শিল্পকলা কেবলই কৌতুকে আবদ্ধ ছিল না, ছিল অনেক সিরিয়াস বিষয়ও। তাই পরে তার নাম বদলে রাখা হয় ‘মূকাভিনয়’।

১৯৬০-এ কলকাতার ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে তাঁর পরিচিতি বাড়ে। অনুষ্ঠানের জন্য ডাক আসতে থাকে নানা প্রান্ত থেকে। বুলগেরিয়ার সোফিয়াতে ধুতি-পাঞ্জাবি পরেই পরিবেশন করেন ‘বার্থ অফ ডেথ’।
মূকাভিনয়ের প্রাণপুরুষ হলেও বিখ্যাত নাট্যদল ‘সুন্দরম’-এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। প্রসঙ্গত, রামপুরহাট থেকে ফারাক্কায় কিছুদিন দিন কাটিয়ে কলকাতায় ফের আসার পর তিনি ভর্তি হন বিমল ঘোষের সংস্থা ‘মণিমালা’তে। সেখানে নাচ, গান, নাটক শেখানো হত। তাঁর শিল্পীসত্তা জেগে ওঠে ওই সময়েই।
১৯৭১। যোগেশ দত্ত গড়ে তোলেন নিজের মূকাভিনয় দল ‘পদাবলী’। এরপর ১৯৭৫ সালে গড়ে তোলেন ‘যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি’। তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৫ সালে পান ‘শিরোমণি পুরস্কার’। ১৯৯৩-তে পান ‘সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার’। ১৯৮৩ সালে তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়। তথ্যচিত্রর নাম ‘সাইলেন্ট আর্ট অফ যোগেশ দত্ত’। এটি মোট ১৪ টি ভাষায় অনূদিত হয়। পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেনেও নির্মিত হয় তাঁকে নিয়ে একাধিক তথ্যচিত্র।
২০০৮-এর ২১ অগাস্ট ৭৩ বছর বয়সে শেষ শো করেন তিনি রবীন্দ্র সদনে। যোগেশ দত্ত’র মতে, সময়ে সরে আসা উচিত মূকাভিনয় থেকে। তিনি জানেন কোথায়, কখন থামতে হয়। তাই যেদিন দেখলেন মন সায় দিলেও শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না সেদিনই ছেড়ে ফেললেন অভিনেতার পোশাক চিরকালের মতো। রবীন্দ্রসদনে শেষদিনের শো-তে কেঁদে ফেলেন যোগেশ দত্ত।…
৫ জনকে নিয়ে শুরু হয় ‘যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি’। আজ ছাত্রছাত্রী সংখ্যা অগণিত। সেখানেই পাড়ি জমায় ‘জাস্ট নিউজ’। দেখে নিল সেখানকার রিহার্সাল। কথা বলে নিল সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে।
যোগেশ দত্ত’র নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সাফল্য, যশ নিয়ে কথা বলার সাহস নেই কারো। তিনি তৈরি করেছেন নিজের মতো আরও কত শত মূকাভিনেতা। যাঁদের মূকাভিনয়ে আজ মাত হন দর্শক।
একটা সময় ছিল যখন এই মূকাভিনয় দেখার জন্য আকাল পড়ত টিকিটের।

“২০০৭-২০০৮ সাল ছিল মূকাভিনয়ের জন্য দারুণ সময়। অগণিত দর্শক সমাবেশে গমগম করত অডিটোরিয়াম। আজ সেই দিন অতীত। আজ সেভাবে আর কেউ দেখতে চায় না মূকাভিনয়। শেখার আগ্রহও বেশ কমে গেছে। আজকের প্রজন্ম তাড়াতাড়ি ফলের আশা করে৷ তাদের ধৈর্য খুব কম। আগে পাঁচ বছরের কোর্স করানো হত। প্র‍্যাকটিক্যাল ক্লাস হত প্রচুর। তাতে একজন শিক্ষার্থী শিল্পী হয়ে উঠত তাড়াতাড়ি। সঠিক অনুশীলন তাকে মজবুত করে তুলত। এখন ছয় মাসের বেশি কেউ কোর্স করতে চায় না। তাই সময় আর চাহিদার কথা মাথায় রেখে মাইম সংস্থাগুলিও ওই ছয় মাসের পথেই হাঁটছে। সেখানে প্র‍্যাকটিস করানোর সময় থাকে না। কেবলই শিখিয়ে দায় সারা হয়। এ ভাবেই বেঁচে আছে শিল্পটা। অনেক জায়গায় অভিনয়ের জন্য ৬ মাস বা তার কম বা তার একটু বেশি সময়ের কোর্স করানো হয়। মাত্র এই কদিনেই যদি কেউ শিল্পী হয়ে যেত তা হলে রবীন্দ্রভারতী, বিশ্বভারতী থাকত না”— এমন কথাই শোনালেন যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমির শিক্ষক শান্তিময় রায়।
দিন রাত এক করে বহু ছাত্রছাত্রী সেখানে নিজেদের আরও বেশি ধারালো করছে মাইম শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে।
শিল্পী যোগেশ দত্ত’র সঙ্গে যাঁদের ওঠাবসা তাঁদের কাছ থেকেই জানা গেল – শিল্পের সঙ্গে কোনওদিন কম্প্রোমাইজ করেননি তিনি। শিক্ষার কোনও বয়স হয় না। এই মন্ত্রে বিশ্বাসী যোগেশ দত্ত। তাই সব বয়সের মানুষ শিখতে আসেন ‘যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি’তে। আকাশবাণীর এক প্রেজেন্টার ‘যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি’র সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত। তাঁর কথায়- “আমার দুটো কাজের সঙ্গে অদ্ভুত মিল বা অমিল আছে। রেডিওতে কেউ আমায় দেখতে পায় না, গলা শুনতে পায়। আর মঞ্চে সবাই আমায় দেখতে পায় কিন্তু গলা শুনতে পায় না।”
“অসম্ভব ডিসিপ্লিন্ড একজন মানুষ যোগেশ দত্ত। শিল্পের সঙ্গে আপোষ করেননি কখনও। কত কঠিন কথা যা মুখে বলতে আমরা ইতস্তত করি তা কত সহজে মূকাভিনয়ের মাধ্যমে বলে দেওয়া যায় তা দেখিয়ে আর শিখিয়েছেন যোগেশ দত্ত।”– জানালেন যোগেশ কন্যা প্রকৃতি দত্ত। তিনি সুগায়িকাও বটে।

– নবনীতা দত্তগুপ্ত