Blog

ভালোবাসার গল্প বলে ‘পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ’

156 Views0 Comment

‘রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা’। এ পৃথিবীতে যেমনি করে রোজ দেখা হয়ে যায় একজনের অন্যজনের সঙ্গে। হঠাৎ করেই এক বন্ধুর সঙ্গে অন্য বন্ধুর। এক মনের সঙ্গে অন্য মনের। ‘আপাতত এইভাবে দুজনের দেখা হয়ে থাকে।’ দুটি মানুষ। একই কামরা। মুখোমুখি সিট। একই গন্তব্য। ট্রেন চলা শুরু করলে আলাপও শুরু হয়। শিক্ষিতা, সুন্দরী, স্মার্ট স্তুতি সান্যাল স্বভাবোচিতভাবে ইন্ট্রোভার্ট। প্রতিবেশী সিটের পুরুষ সহযাত্রীর দিকে অযথা মনোযোগ দিতে নারাজ। পুরুষ ভদ্রলোকটি আবার গল্প করতে এবং গল্প বলতে ভালোবাসেন। মামুলি দু-চারটে কথা বার্তার পর নিতান্ত সাদামাঠা চেহারার ভদ্রলোক তাঁর গল্পের ঝুলি খুলে বসেন। অদ্ভূতভাবে মৃত্যু তাঁর গল্পের প্রধান উপাদান হিসেবে হাজির হয়। ভূমিকা হিসাবে অকাট্য যুক্তি দেন স্তুতিকে। বলেন মনুষ্য জীবনের সবথেকে বড় রূঢ় বাস্তব মৃত্যু যা কিনা প্রাচীনকাল থেকে রয়েছে। প্রথম গল্পে এক বাবার মৃত মেয়েকে ফিরে পাবার সাধনা স্তুতিকে আবেগী করে তোলে। সহযাত্রীর গল্প বলার ধরনে সে খানিকটা হলেও আকর্ষিত হয়ে পড়ে। পরের গল্প শুনতে ইচ্ছুক স্তুতির ট্রেন জার্নির একঘেয়েমি একাকীত্ব কোথাও গিয়ে ম্লান হতে থাকে। আধুনিকা, স্মার্ট স্তুতির পূর্ণজন্মে বিশ্বাসী হতে ইচ্ছে করে। ভদ্রলোক এবার এক অভিশাপমুক্তির গল্প শোনান। হাজার বছরের অভিশাপ। অভিশাপ কাটিয়ে নতুন এক শুরুর গল্প। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার গল্প। গল্প শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে পড়ে স্তুতি। পরের গল্প শুনতে চায়। এবার ওই ‘সাদামাটা’ ভদ্রলোক স্তুতিকে এমন এক গল্প শোনান যে গল্প শিহরন জাগায় মনে। সে গল্প অলৌকিক, অবিশ্বাস্য যার কোন ব্যাখ্যা হয় না আমাদের নাগরিক জীবনে। তবুও সেসব ঘটে। ঘটে থাকে। প্রতিটা গল্পেই সমস্যা থাকে। অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধারের মতো সেসব কখনো কখনো হানা দেয় আমাদের জীবনে। কখনো তার যুক্তি থাকে, কখনো থাকে না। বিশ্বাস, ভালোবাসা, মনের জোর দিয়ে আগলাতে হয় সেসব। প্রতিকূলতা থাকে। জটিলতা থাকে। পেরোতে হয় সব। পেরোনোই যে জীবন। কখনো পেরোনো যায় না। হেরে যেতে হয়। তবে সব গল্পে ‘ডাম্বলডোর’ এর মতো একজন আসেন। সমস্যার সময় কোথা থেকে এসে হাজির হন তিনি। সমাধান বাতলে গিয়ে আবার উধাও হয়ে যান। সহযাত্রী ভদ্রলোক ‘মুশকিল আসান’ রূপে যাকে নিয়ে আসেন তাঁর পরিচয় তিনি নবদ্বীপবাসী। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সতীর্থ শ্রী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। জানা যায়, ‘বৃহৎ তন্ত্রসার:’ এর রচয়িতা এই মানুষটিই বাংলায় দক্ষিণা কালী মূর্তি যে রূপে পূজিত হয় তার প্রচলনকর্তা। স্তুতির শোনা তিনটে গল্পের সমস্ত সমস্যার ‘সুলুক সন্ধানী’। তাঁর মুশকিল আসান মন্ত্রটির নাম ‘ভালোবাসা’। আসেন, সমাধান করেন, চলে যান। বলে যান, ‘ভালোবাসাই সবথেকে বড় তন্ত্র, সবথেকে বড় জাদু’। গল্প শুনতে শুনতে গন্তব্য এসে পড়ে। দীর্ঘ যাত্রাপথের শেষে সহযাত্রীকে বিদায় জানানোর ক্ষণ এসে পড়ে। কোন এক স্টেশনে দেখা হয়ে যায় যেমন, তেমন কোন এক স্টেশনে ছেড়ে চলে যেতে হয়। পড়ে থাকে অনেক স্মৃতি, গুচ্ছের মুহুর্ত আর রাজ্যের কথারা। তিনটে গল্পের শেষে আর একটা নতুন গল্প গড়ে ওঠে। যে গল্প আলোর গল্প, সকালের শিশির লেগে থাকা তাজা পাতার মত বন্ধুত্বের গল্প। প্রিয় বন্ধুর হাতে হাত রাখার মত ভরসার কাহিনী। সে গল্প হয়ে ওঠে এক আশ্রয়ের আখ্যান। মনের আশ্রয়। বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার এক আশার গল্প।

এমনিভাবেই শেষ হয় JUST STUDIO প্রযোজিত, প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি ‘পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ উত্তর আসবেই’। প্রথমবার প্রযোজনা করলেন অভিনেত্রী সুচন্দ্রা ভানিয়া। পরিচালক রাজর্ষি দে’র প্রথম ছবি এটি। অনেকগুলো প্রথম এই ছবিটির সঙ্গে যুক্ত। জনপ্রিয় লেখক অভীক সরকারের বেস্ট সেলার ‘এবং ইনকুইজিশন’ এর চারটি গল্পের তিনটি যথাক্রমে ‘ভোগ’, ‘শোধ’, ‘রক্তফলক’ এই ছবির মূল উৎস। ছবির চিত্রগ্রহনের মূল দায়িত্ব সামলেছেন আআন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সিনেমাটোগ্রাফার রঞ্জন পালিত। ছবিটাকে সুরে বেঁধেছেন অর্থাৎ সংগীত এবং আবহ সাজিয়েছেন বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক শ্রী দেবজ্যোতি মিশ্র। তিনটি গান তাঁর সুরে গেয়েছেন এই সময়ের প্রখ্যাত তিন সংগীত শিল্পী রূপঙ্কর বাগচী, ইমন চক্রবর্তী, অর্ক মুখার্জী। আর এই তিনটি গানের কথা যিনি কলমবন্দী করেছেন তিনি হলেন বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। শিল্প নির্দেশক হিসাবে ছিলেন এই সময়ের গুণী শিল্পী শ্রী তন্ময় চক্রবর্তী। আলোর পরে অন্ধকারকে যেমন মেনে নিতে হয়, জন্মের আনন্দের সাথে মৃত্যুর দু:খকেও, এই ছবিও যেমন করে অনেক প্রথমে ভরা, তেমনি কিছু শেষের কথাও বলে। চিত্র সম্পাদক সঞ্জীব কুমার দত্তের সম্পাদিত শেষ ছবি এটি। অভিনেতা মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের অভিনীত শেষ ছবি এটি। ছবিতে অভিনয় করেছেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়, রাজেশ শর্মা, পরাণ বন্দোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সুচন্দ্রা ভানিয়া, গৌরব চক্রবত্তী, বিদীপ্তা চক্রবত্তী, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, আরিয়ান ভৌমিক, দামিনী বসু, ঈশিকা দে, রিচা শর্মা, মালবিকা সেন, মানবী বন্দোপাধ্যায়, কৌশিক কর, সত্রাজিৎ সরকার, রাহুল সেনগুপ্ত, পায়েল দেব, নন্দিতা চ্যাটার্জী, শ্যামাশীষ পাহাড়ী মত একগুচ্ছ দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী। পুরুলিয়ার অখ্যাত নীলডি পাহাড়ের কোলে বা চন্দননগরের রাস্তায় কিংবা কলকাতার এখানে ওখানে ২০১৮ এর ডিসেম্বর জুড়ে শুটিং চলেছিল হইহই করে। দীর্ঘ পোস্ট প্রোডাকশন শেষে একে একে মুক্তি পেল ছবির লোগো, টিজার, ট্রেলার। ট্রেলার লঞ্চে হাজির থাকলেন ইন্ডাস্ট্রির অভিভাবক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসিত হল ছবির ট্রেলার, টিজার। ডিজিটাল প্রোমোশন চলল রমরম করে। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ যিনি কিনা আমাদের ছবির ‘Dumbledore’, নবদ্বীপবাসী সেই মানুষটি সম্পর্কে দর্শকদের জানাতে আমরা তৈরী করলাম তিনটে ভিডিও ডকুমেন্টারি। শহর ছেয়ে গেল ‘উত্তর আসবেই’ এর পোস্টারে। শহরবাসীর মধ্যে তৈরী হল কৌতূহল, উন্মাদনা। এরপর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত, বহু প্রত্যাশিত দিন। ২২শে নভেম্বর, ২০১৯। মুক্তি পেল ‘পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ উত্তর আসবেই’। প্রিমিয়ারে হাজির থাকলেন ছবির অভিনেতা অভিনেত্রী সহ সমস্ত কলা কুশলীরা। কলকাতা সহ শহরতলীর বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ভিড় করলেন ছবিটি দেখতে। ‘এক নতুন ঘরানার ছবি এ এক’ প্রায় সবার মুখেই ঘুরতে লাগল এমন কথা। নির্বাচিত হল বেশ কয়েকটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। তেলেঙ্গানা বেঙ্গলি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আয়না ২০১৯ এ আমাদের ‘স্তুতি’ অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় জিতে নিলেন সেরা সহ অভিনেত্রীর পুরস্কার। ২৮ তম কলাকার অ্যাওয়ার্ডসে পেল ২০১৯ এর সেরা বাংলা ছবির স্বীকৃতি। ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পরিচালিত ‘সিনেমার সমাবর্তন’ অর্থাৎ WBFJA অ্যাওয়ার্ডসে নির্বাচিত হল। রঞ্জন পালিত পেলেন সেরা সিনেমাটোগ্রাফারের মনোনয়ন। জয়পুর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (JIFF) এ নির্বাচিত হয়েছে ছবিটি। নির্বাচিত হয়েছে Lift-Off Film Festival এও। পুরস্কার, সম্মান, স্বীকৃতি আসে। মনে থেকে যায়। আর ঠিক সেইখান থেকেই শুরু হয় পরবর্তী উদ্যোগের প্রস্তুতি । ভালোবাসার মন্ত্রেই চালিত হতে থাকি আমরা। ছড়াতে থাকি ভালোবাসার মন্ত্র। কখনো মিলন, কখনো বিচ্ছেদ, কখনো পরিণতি, কখনো পরিণতিহীন, কখনো পাওয়া, কখনো না পাওয়া সব ভালোবাসার গল্পই জমা হতে থাকে জীবনে। সেইসব গল্প কখনো চলচ্চিত্রের আকার পায়, কখনো পায়না। JUST STUDIO’র পরের উদ্যোগে হয়তো তেমনি কিছু ঠিকানাহীন খামে মোড়া ভালোবাসা থাকবে। আসলে ভালোবাসার সংজ্ঞা নিরূপন করা বোধহয় এতো সহজ নয়। সেই প্রশ্নচিহ্ন আজীবনকাল থেকে যায় জীবনে, “ভালোবাসা কারে কয়?”