Blog

ভালোপাহাড়ের বৃক্ষ মানব কমল চক্রবর্তী

569 Views0 Comment

“পৃথিবীকে তোমরা ঠিক কোন দিক থেকে দেখতে চেয়েছিলে সেটা আমার জানা দরকার।
একজন বলল, “আমার জুতোর কারখানা যেদিকে আমি সেদিক থেকে পৃথিবীকে দেখি।” একজন বলল, “আমার মদের দোকান, কিন্তু আমি মদ খাই না। তবু পৃথিবীকে একটা বড়সড় ভাটিখানা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।” আর একজন বলল, “পৃথিবীতে আমি পিকনিক করতে এসেছি। কয়েকটা মেয়েছেলে নিয়ে এসেছিলাম, যাবার সময় কয়েকটা নিয়ে যাব। ভোগ করতে শিখুন।”

ষাটের দশকের শেষের দিকে জামশেদপুরের সমমনস্ক পাঁচ বন্ধুকে একসঙ্গে ‘পঞ্চ পান্ডব’ বলা হত। বারীণ ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী, সুভাষ ভট্টাচার্য, অরুণ আইন, শক্তিপদ হালদার এই পাঁচজন। ‘কৌরব’ নাটক মঞ্চায়ন করতে গিয়ে জোটবদ্ধ হন তাঁরা। পাঁচজনেই প্রকৃতি প্রেমী, সাহিত‍্যানুরাগী, পাঁচজনেই অ‍্যাডভেঞ্চারাস। কাব‍্য ও প্রকৃতির সান্নিধ‍্য পেতে তাঁরা বন,পাহাড়, সমুদ্রতীরে কবিতা ক‍্যাম্প শুরু করেন। গহন বনে, কখনো পাহাড়ের খাঁজে কখনো বা সমুদ্রের তীরে শুরু হল কবিতা পাঠ।

সাহিত‍্য চর্চা। প্রকৃতির মাঝে বসে সাহিত‍্যে অবগাহন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে থাকেন ওঁরা পাঁচজন। এই সবের মাঝেই পঞ্চ পান্ডবের যৌথ উদ‍্যোগে জন্ম নেয় ‘কৌরব’। লিটিল ম‍্যাগাজিন। মূলত কবিতার কাগজ। সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে নেন কমল চক্রবর্তী। জামশেদপুর টাটা কোম্পানির মোটা মাইনের সুদর্শন ইঞ্জিনিয়ার কমল চক্রবর্তী। ‘কৌরব’ লিটিল ম‍্যাগাজিন হিসাবে সর্বত্র বেশ নাম করছে তখন। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ‘কৌরব’ এর ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ সকলে। খ‍্যাতির মধ‍্যগগনে থাকা সাহিত‍্যের নক্ষত্র সুনীল গঙ্গোপাধ‍্যায় ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখলেন ”বাংলার বাইরে থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার সেরা ম‍্যাগাজিন ‘কৌরব'”। সম্পাদক হিসাবে কমল চক্রবর্তীরও পরিচিতি বাড়ছে ক্রমশ। নিশ্চিত চাকরি সঙ্গে লেখালেখি, লিটিল ম‍্যাগাজিনের সফল সম্পাদনা সব মিলিয়ে কমল চক্রবর্তী ভীষনই ব‍্যস্ত তখন। এ সবের মাঝেও চলছিল ঘুরে বেড়ানো।

অরণ‍্যে, পাহাড়ে, সমুদ্রে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন এসে পড়লেন দলমা রুয়াম পাহাড় বেষ্টিত বান্দোয়ান নামের এক অঞ্চলে। নির্জলা জনহীন প্রান্তর। ধূ ধূ মরুভূমি। কয়েক ঘর শবর, মুন্ডা, ওঁরাও, কোল, ভীল এর মতো জনজাতির বসবাস। খাবার নেই, পানীয় জল নেই। স্কুল নেই, হাসপাতালও নেই। শুষ্ক, বালিময় একটা স্থান। সাঁওতাল অধিবাসীরা দূর থেকে মাটি খুঁড়ে তুলে আনে জল। পাঁচ বন্ধু ঠিক করলেন বৃক্ষরোপন করতে হবে এখানে। করলেনও। এরপর কমল চক্রবর্তী সিদ্ধান্ত নিলেন, এখানেই থেকে যাবেন জীবনের বাকি দিনগুলো। গাছ লাগাবেন। রুক্ষ মরুভূমির বুকে প্রাণ আনবেন। টাটা কোম্পানীর মোটা বেতনকে কার্যত বুড়ো আঙ্গুল দেখালেন। ডেরা বাঁধলেন পাহাড়ি এই প্রান্তরে। বন্ধুরা ফিরে গেলেন, কমল বাবু ফিরলেন না। থেকে গেলেন এই জনহীন মরুভূমিতে। ‘একাই থাকব, একাই দুটো ফুটিয়ে খাব, দু এক মুঠো ধুলো বালি।’ ভাবলেন গাছ লাগাতে হবে অনেক অনেক। শুষ্ক মাটিকে সরস করে তুলতে হবে। একটা দুটো নয়, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার জমিতে গাছ লাগাতে থাকলেন। সংখ‍্যাটা বাড়তে থাকল। একশ, দুশো, পাঁচশো, হাজার, লাখ… শুষ্ক প্রকৃতির কোল জুড়ে বেড়ে উঠতে লাগল অশ্বথথ, পাকুড়, শিমূল, সপ্তপর্ণী, গামার, মহুয়া, হরিতকি, অর্জুন, শাল, শিরিষ, মেহগনী, মেজুরি, সোনাঝুড়ি, পলাশ, আম, কাঁঠাল, হিজল, শিশু, কেয়া, ছাতিম, ঝাউ, দেবদারু, মুসানডা, বাদরলাঠি, বহেড়া, ধাওয়া, কেঁদ, থাইবট, চন্দন, কফি, মুচকুন্দ, জামরুল, জাম, আঙুর, আপেল সব গাছেরা। ১৯৯৭ তে শুরু হয়ে ২০২০। সংখ‍্যাটা বারো লক্ষ ছাড়িয়ে ক্রমবর্ধমান। ওইসব অরণ‍্যে সকাল সন্ধ‍্যে গান গায় টিয়া, ঘুঘু, বুলবুল, বসন্তবৌরি, ইষ্টিকুটুম, কোকিল, শালিক, কাক, চড়াই, টুনটুনি, হাড়িচাঁচা, মুনিয়া, রক, বেনেবৌয়ের দল।

হাওড়া-জামশেদপুর ইস্পাত ট্রেন ধরে নির্জন গালুডি স্টেশন। তারপর অটো বা গাড়িতে বেশ কয়েক কিলোমিটার অতিক্রম করে ‘ভালো পাহাড়’। কমল চক্রবর্তীর ডেরা। ‘ভালো পাহাড়’ নামটাও তাঁরই দেওয়া। ‘ভালো পাহাড়’ এখন দুদিনের ছুটি কাটানোর টুরিস্ট স্পটও বটে। শুষ্ক মরুভূমি এখন বসবাসের উপযোগী। কমলবাবুর নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং বেশ কিছু সহৃদয় মানুষের অর্থানুকূল‍্যে গড়ে তুললেন ভালোপাহাড় স্কুল, ভালোপাহাড় হাসপাতাল। ভালোপাহাড়ে এখন রয়েছে সুশ্রুত পানীয় জলের কল, মোরাম ঘাসে বিছানো সবুজ পার্ক, সম্পূর্ণ আধুনিক ব‍্যবস্থা সম্পন্ন অতিথিশালা। ভালোপাহাড়ের ক্ষেতের টাটকা সব্জী, পুকুরের জ‍্যান্ত মাছের ঝোল দিয়ে চাষ করা ধানের চালের গরম ভাত সহ আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তায় ভালোপাহাড় মন ছুঁয়ে নেবেই। এ যেন এক রূপকথার গল্প। “এক পৃথিবীর একশোরকম স্বপ্ন দেখার, সাধ‍্য থাকবে যে রূপকথার, সে রূপকথা আমার একার।” এমনটাই যেন ‘বৃক্ষ-Man’ কমল চক্রবর্তীর স্বপ্ন আস্তানা। গাছেদের ইস্কুল যেন বসেছে গোটা ভালোপাহাড় জুড়ে। আর ”এগাছ ওগাছ উড়ছে পাখি, বলছে পাখি, এই অরণ‍্যে কবির জন‍্য আমরা থাকি।” “বলছে ওরা কবির জন‍্যে, আমরা কোথাও, আমরা কোথাও, আমরা কোথাও হার মানিনি।”

প্রকৃতি প্রেমিক কমল চক্রবর্তী একজন কবি, একজন সাহিত‍্যস্রষ্টা। জীবনের অন‍্য অধ‍্যায় থেকে বিরতি নিলেও সাহিত‍্য সৃষ্টিতে তিনি বিরামহীন। যিনি কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন গোটা পঁচিশেক উপন‍্যাসও। ‘হে বৃক্ষনাথ’ নামের বইটিতে
রয়েছে বৃক্ষ দেবতাকে নিয়ে লেখা একাধিক কবিতা। হ‍্যাঁ, প্রতিটি বৃক্ষ তাঁর কাছে দেবতা। কেননা এই পৃথিবীতে যা কিছু, সবই বৃক্ষের দান। তাই পৃথিবীর বক্ষকুলের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ তিনি। রাতের দিকে ভালো পাহাড়ের জঙ্গল থেকে, গাছেদের সারি থেকে ভেসে আসে ‘জয় বৃক্ষনাথ’ এই উচ্চারনে কমল চক্রবর্তীর গলা। ভালোপাহাড়ে, গাছেদের ভিড়ে হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন ‘বৃক্ষ-Man’ কমল চক্রবর্তী। গাছেরা তাঁর একান্ত আপনজন। বড় আপনজন। গাছেদের সাথেই তাঁর নিবিড় আত্মীয়তা। গাছেদের সাথেই তাই আপনমনে কথা বলেন তিনি। কখনো একমনে তাকিয়ে থাকেন দূরে, অনেকদূরে
“বনের পরে, মাঠের পরে, নদীর পরে
সেই যেখানে সারাজীবন বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে
সেই যেখানে কেউ যায়নি, কেউ যায়না কোনদিনই
আজ সে কবি দেখতে পাচ্ছে সেই দেশে সেই ঝরনাতলায়
এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়
সোনায় মোড়া মেঘ হরিণী
কিশোরবেলার সেই হরিণী।”

– মউলি রায়